আরও দেশ ছেড়েছেন যাঁরা
ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পর থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি মধ্যম ও নিম্ন সারির অনেক নেতাও দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। এ ছাড়া অনেকে পালানোর সুযোগ খুঁজছেন বলে জানা গেছে। যাঁদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা, দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।
এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের আরও যেসব নেতার দেশত্যাগের খবর পাওয়া গেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন (রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র), সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ (জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ) ও শফিউল আলম চৌধুরী (নাদেল), দলের দপ্তর সম্পাদক ও শেখ হাসিনার সাবেক বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়া, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম ও কার্যনির্বাহী সদস্য নির্মল কুমার চ্যাটার্জি। এ ছাড়া সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, কুমিল্লা সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার ও তাঁর মেয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র তাহসিন বাহার এবং ফেনীর সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীও দেশ ছেড়েছেন বলে জানা গেছে।
এই তালিকায় আরও রয়েছেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম সারোয়ার কবির (ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক), যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য মাইনুল হোসেন (নিখিল), ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ (ইনান), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির (শয়ন), ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ, যুবলীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জয়দেব নন্দী প্রমুখ।
এ ছাড়া বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বিপ্লব কুমার সরকারও ১০ সেপ্টেম্বর লালমনিরহাটের পাটগ্রামের দহগ্রাম সীমান্ত দিয়ে দেশ ত্যাগ করেছেন বলে খবর বের হয়েছে। এমন আরও অনেকে এভাবে দেশ ছাড়ার চেষ্টায় আছেন বলে জানা গেছে।
কোন পথে, কীভাবে দেশ ছাড়ছেন
ইতিমধ্যে দেশ ত্যাগ করেছেন এমন বেশ কয়েকজনের পরিবার, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেট, আখাউড়া (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ (হালুয়াঘাট), যশোর অঞ্চল, লালমনিরহাটসহ উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে দেশ ছাড়ার প্রবণতা বেশি। এ জন্য জনপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ২৫-৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয় সীমান্তের দুই পাশের দালালদের।
ভারতে পালানোর সময় গত ২৩ আগস্ট সিলেটের কানাইঘাট সীমান্তে স্থানীয় লোকজনের হাতে ধরা পড়েন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী (মানিক)। স্থানীয় লোকজনের ধারণ করা একটি ভিডিওতে তখন তাঁকে বলতে শোনা যায়, তিনি ১৫ হাজার টাকা চুক্তিতে ভারতে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। যাঁদের সহায়তায় তিনি পালাচ্ছিলেন, তাঁরা তাঁর কাছে থাকা ৬০-৭০ লাখ টাকা নিয়ে গেছেন এবং সীমান্তের ওপারে নিয়ে মারধর করেছেন।
২৪ আগস্ট রাতে সিলেটের কানাইঘাটের ডোনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর সময় মারা যান ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আলী খান (পান্না)। লাশ উদ্ধারের পর মেঘালয় পুলিশ সূত্র গণমাধ্যমকে বলেছে, গলা টিপে শ্বাসরোধের কারণে ইসহাকের মৃত্যু হয়েছে।
১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্তে আটক হন চট্টগ্রামের রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী।
পলাতক অন্য ব্যক্তিরা কোথায়
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীসহ ওই সরকারের সুবিধাভোগীরা আত্মগোপনে চলে যান। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন সেনানিবাসে ৬২৬ জন আশ্রয় নেন বলে ১৮ আগস্ট আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনীতিক, বিচারক, প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের মধ্যে কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও বাকিরা সেনানিবাস থেকে বের হয়ে কোথায় অবস্থান করছেন, সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু জানা যায়নি। তবে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ দেশ ছেড়েছেন বলে প্রচার আছে।
এ ছাড়া আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান, মোহাম্মদ হারুন অর রশীদসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা আত্মগোপনে আছেন। আবার আত্মগোপনে থাকা কেউ কেউ গ্রেপ্তার এড়াতে দেশ ছেড়েছেন বলে ঘনিষ্ঠদের দিয়ে প্রচার করাচ্ছেন বলেও জানা গেছে।
তাঁরা কীভাবে ভারতে আছেন
পাসপোর্ট, ভিসা ছাড়া কিংবা ইমিগ্রেশন সম্পন্ন না করে পলাতক ব্যক্তিদের বিষয়ে ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সহনশীল আচরণ করছে বলে জানা গেছে। তাঁদের কারও কারও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বসবাসের অনুমতি (পিআর) বা গ্রিন কার্ড রয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ ভারতের ইমিগ্রেশন বিভাগকে ‘ম্যানেজ’ করে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে। সিলেট সিটি করপোরেশনের সদ্য সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী এই প্রক্রিয়ায় ভারত থেকে লন্ডনে পাড়ি জমিয়েছেন বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কেউ কেউ অবৈধ পথে ভারতে গিয়ে দালালের মাধ্যমে পাসপোর্টে বাংলাদেশ থেকে বহির্গমন ও ভারতের প্রবেশের সিল লাগানোর ব্যবস্থা করছেন।
বিত্তশালীরা পালিয়েছেন, কর্মীরা কষ্টে
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিপুল অর্থের মালিক আওয়ামী লীগের এমন নেতাদের দেশ ছাড়ার প্রবণতা বা চেষ্টা বেশি।
এ নিয়ে দেশে অবস্থান করা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের ১১ জন নেতার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাঁরা বলেন, দেশ ছাড়ার পর নেতারা আর দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের খোঁজ নিচ্ছেন না। অনেকে আগের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরসহ ফেসবুক ও মেসেঞ্জার বন্ধ রেখেছেন। বিপদে আছেন তৃণমূলের অসচ্ছল নেতা-কর্মীরা।
হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামিদেরও সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক নাইম আহমেদ বলেন, যাঁরা ভারতে যাচ্ছেন, তাঁরা তো আগে দেশের ভেতর দিয়েই সীমান্তে যান। তাঁরা কীভাবে সীমান্তে যাচ্ছেন, সেটা জানা জরুরি। পাশাপাশি তল্লাশিচৌকি বসিয়ে নজরদারি জোরদার করতে হবে। এ ছাড়া সীমান্তে মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।