বিশেষ প্রতিবেদন | ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশে তাঁরা এখন পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। কারও বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, কারও বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ কিংবা শত শত কোটি টাকা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ। অথচ বিদেশের মাটিতে বসে তাঁরাই এখন লিপ্ত রয়েছেন দেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালের গভীর চক্রান্তে। কলকাতার বিলাসবহুল শপিং মলের ফুডকোর্টে ব্ল্যাক কফি আর ফাস্টফুডে কামড় দিতে দিতে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের অন্তত ছয় শতাধিক শীর্ষ নেতা এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার চূড়ান্ত নকশা তৈরি করছেন।
হাসিনার গোপন আস্তানা ও ভার্চুয়াল রাজনীতি: গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে হেলিকপ্টারে ভারত পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে দিল্লির একটি কঠোর সুরক্ষিত গোপন স্থানে অবস্থান করছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে জুলাই-আগস্টের গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলেও, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে ভারত থেকেই সমান্তরাল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। ভারতের কড়া নজরদারির মধ্যেই তিনি প্রতিদিন বাংলাদেশের তৃণমূল নেতাকর্মী, সাবেক সংসদ সদস্য এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করছেন। তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা নিয়মিত লন্ডন থেকে এসে তাঁকে সঙ্গ দিচ্ছেন।
কলকাতায় ৬০০ নেতার জটলা: আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা হয়ে প্রায় ছয় শতাধিক প্রভাবশালী নেতা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। এই তালিকায় মন্ত্রিসভার সদস্য থেকে শুরু করে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের মতো বিতর্কিত নামও রয়েছে। সাদ্দাম হোসেন দাবি করেছেন, তাঁরা কারাগারের ভয়ে নয়, বরং দেশে ফিরলে ‘হত্যার শিকার’ হওয়ার আশঙ্কায় কলকাতায় অবস্থান করছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, শেখ হাসিনা নিয়মিত তাঁদের মাধ্যমে দলকে আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করার দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
নির্বাচন বর্জন ও বানচালের চক্রান্ত: ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ওপর আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা থাকায় দলটি এখন ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক জানিয়েছেন, তাঁরা কর্মীদের নির্বাচন থেকে বিরত থাকতে এবং সকল ভোট ও প্রচারণা বর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে গোয়েন্দা তথ্য বলছে, বর্জনের আড়ালে মূলত নির্বাচন বানচাল এবং ভোটারদের মাঝে ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্যে হাজার হাজার সমর্থককে সংগঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে দলটি।
স্বৈরশাসনের ১৫ বছর বনাম বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার: টানা ১৫ বছরের স্বৈরশাসনে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং আয়নাঘরের মতো গোপন বন্দিশালা তৈরির মাধ্যমে শেখ হাসিনা দেশ শাসন করেছিলেন। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে তাঁর শাসনের অন্ধকার চিত্র ফুটে উঠলেও, বর্তমানে পালিয়ে থাকা নেতারা এখন মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের বুলির আড়ালে আত্মরক্ষা করতে চাইছেন। অন্যদিকে, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিলেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কিছু মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
ভারত সরকার বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের একাধিক অনুরোধ এখন পর্যন্ত উপেক্ষা করে চলছে। ফলে দিল্লির এই প্রশ্রয় এবং কলকাতার নেতাদের এই তৎপরতা আগামী নির্বাচনকে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
For more information
আরো দেখুন