সিলেট ১৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৮শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের ঢল: কারওয়ান বাজার থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত নিথর জনসমুদ্র

admin
প্রকাশিত ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫, ০৯:০৩ অপরাহ্ণ
খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের ঢল: কারওয়ান বাজার থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত নিথর জনসমুদ্র

এক শোকাতুর পদযাত্রা: গন্তব্য যখন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ

ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ১২টা ৪০ মিনিট। রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের দিকে তাকালে মনে হচ্ছিল, ঢাকা শহর তার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে এক বিশাল শোকযাত্রার মিছিলে রূপ নিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ—কারও মাথায় টুপি, কারও হাতে জাতীয় পতাকা, সবার গন্তব্য একটাই—প্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা।

কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ ধরে এগোতেই দেখা গেল এক বিরল দৃশ্য। সড়কের দুই পাশ, ফুটওভারব্রিজ, এমনকি ভবনের ছাদগুলোও মানুষের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ। কোনো স্লোগান নেই, নেই কোনো রাজনৈতিক হাঁকডাক; এক অদ্ভুত নীরব শৃঙ্খলা যেন গ্রাস করেছে পুরো শহরকে।

খালেদা জিয়ার জানাজা উপলক্ষে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা হয়ে ওঠে লোকারণ্য। আজ বুধবার দুপুরে

দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি

জানাজায় অংশ নেওয়া এই জনস্রোতে শুধু যে রাজনৈতিক কর্মীরা ছিলেন তা নয়, বরং সাধারণ পেশাজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। শাহবাগ থেকে পায়ে হেঁটে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আমিরুল ইসলাম বলছিলেন, “আমি রাজনীতি করি না, কিন্তু এই নেত্রী দেশের মানুষের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তার জন্য কয়েক কিলোমিটার হাঁটা কোনো কষ্টই নয়।” এমনকি নীলফামারী বা দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষরা গত রাত থেকে যাত্রা শুরু করে ক্লান্ত শরীরেও এই মিছিলে শামিল হয়েছেন। ভিড় এতটাই ঘন ছিল যে, অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থেকে শুরু করে অশীতিপর বৃদ্ধ—সবাইকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পৌঁছানোর আগেই সড়কের ওপর কাতারবদ্ধ হতে দেখা যায়।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারেও কাতারে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন মানুষ। আজ বুধবার দুপুরে

সড়ক ছাড়িয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে জানাজা

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এবং সংসদ ভবন এলাকা দ্রুতই লোকারণ্য হয়ে পড়ায় জায়গা সংকুলান করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ভিড় সড়ক ছাড়িয়ে ফার্মগেটে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে এক্সপ্রেসওয়ের ওপর দাঁড়িয়েই জানাজার অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়। জায়গা না পেয়ে অনেকে সড়কের ওপর সংবাদপত্রের পাতা বিছিয়েই জোহরের নামাজ ও জানাজার জন্য কাতারবদ্ধ হন।

জনসমুদ্রে পরিণত হয় জানাজাস্থল। আজ বুধবার দুপুরে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ

স্মৃতিতে অম্লান ‘আপসহীন নেত্রী’

দূর থেকে মাইকে যখন খালেদা জিয়ার সেই চিরচেনা কণ্ঠ বাজছিল—“দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নাই, এটাই আমার ঠিকানা…”—তখন উপস্থিত হাজারো মানুষের চোখে পানি ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ১৯৪২ সালে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে প্রায় ৪৩ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি যেভাবে এক গৃহবধূ থেকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হয়ে উঠেছিলেন, আজ তাঁর শেষ বিদায়ের এই দৃশ্য সেই জনপ্রিয়তারই প্রমাণ দিল।

১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়া থেকে শুরু করে তিনবার দেশ শাসন করা এই নেত্রীর জানাজা কেবল একটি দলের আয়োজন ছিল না, বরং তা পরিণত হয়েছিল গণমানুষের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশে।

ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা এক মুহূর্ত

ভিড় ঠেলে কারওয়ান বাজারের দিকে ফেরার সময় দেখা গেল হাজার হাজার মানুষ মাইকের জানাজার নির্দেশনার অপেক্ষায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে অনেক চড়াই-উতরাই দেখা এই নেত্রী আজ তাঁর প্রিয় দেশের মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হতে চললেন। এই বিশাল জনসমাগম প্রমাণ করল, রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একজন জননেতা হিসেবে মানুষের হৃদয়ে তাঁর স্থান কতটা গভীরে।

For more information

আরো দেখুন