জুলকার নাইন সাইরাসঃ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছিল। মানুষের প্রত্যাশা ছিল—রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন কমবে, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সংস্কার হবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। কিন্তু অভ্যুত্থানের পরপরই যে বাস্তবতা তৈরি হয়, তা ছিল ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস হলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরের পুরনো দুর্বলতা অক্ষত রাখা। এই দুর্বলতার ফলেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে শুরু করে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ওপর।
অভ্যুত্থানের পর প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব। মাঠপর্যায়ের পুলিশ ও প্রশাসন বুঝে উঠতে পারেনি—কার নির্দেশ কার্যকর, কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নযোগ্য। এই অনিশ্চয়তার সুযোগ নেয় রাজনৈতিক কর্মী, প্রভাবশালী মহল এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। তখন থেকেই চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সহিংসতার ঘটনা বাড়তে থাকে, যা প্রশাসন প্রাথমিকভাবে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে এড়িয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে এগুলো ছিল একটি নতুন অপরাধচক্রের উত্থানের সূচনা।
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, সহিংসতার মাত্রা তত বাড়ে—এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। কিন্তু ২০২৪–২০২৫ সময়কালে পার্থক্য ছিল এখানে: এবার রাষ্ট্র নিজেই প্রতিরোধমূলক ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, প্রার্থী বাছাই নিয়ে সংঘর্ষ এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের লড়াই সরাসরি হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তি আগে থেকেই হুমকির মুখে ছিলেন, স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি জানত, কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে হত্যাগুলো আকস্মিক নয়, বরং পূর্বানুমেয় হওয়া সত্ত্বেও ঘটেছে—এটাই রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
এই সময়কালে একাধিক রাজনৈতিক কর্মী ও ব্যবসায়ী প্রকাশ্যে খুন হন, যাদের হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত ছিল। তদন্ত শুরু হলেও অধিকাংশ মামলায় চার্জশিট দিতে বিলম্ব হয়, সাক্ষীরা ভয় পেয়ে সরে যান এবং অভিযুক্তদের একটি অংশ জামিনে বেরিয়ে আবার এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে। এতে স্পষ্ট হয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শক্তি থাকলেও তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতা কাজ করছে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভ্যুত্থানের পর গোয়েন্দা তৎপরতা পুনর্গঠনের সুযোগ ছিল, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো হয়নি। বরং গোয়েন্দা সংস্থার একটি বড় অংশ রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও অভ্যন্তরীণ নজরদারিতে ব্যস্ত থাকায় মাঠপর্যায়ের অপরাধচক্র শক্তিশালী হয়ে ওঠে। চাঁদাবাজ নেটওয়ার্ক, অস্ত্র সরবরাহ এবং স্থানীয় সন্ত্রাসীদের চলাচল সম্পর্কে তথ্য থাকলেও তা সময়মতো কাজে লাগানো হয়নি, ফলে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটে যায়।
সরকার বারবার বলছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে, কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকত, তাহলে কেন একই এলাকায় বারবার খুন হচ্ছে, কেন অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়েও দ্রুত মুক্তি পাচ্ছে, কেন সাধারণ মানুষ থানায় যেতে ভয় পাচ্ছে—এই প্রশ্নগুলোর কোনো সন্তোষজনক উত্তর নেই। এটি প্রমাণ করে সমস্যাটি ব্যক্তি বা বিচ্ছিন্ন ঘটনার নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার।
আরও উদ্বেগজনক হলো, এই সময়কালে গণপিটুনি ও লিঞ্চিংয়ের মতো ঘটনাও বেড়েছে। এটি রাষ্ট্রের ওপর মানুষের আস্থাহীনতার নগ্ন প্রকাশ। মানুষ যখন মনে করে আইন তাদের রক্ষা করবে না, তখন তারা নিজেরাই বিচার করতে চায়। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক কর্তৃত্ব হারানোর লক্ষণ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ও ছবি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। রাষ্ট্র সেখানে কার্যকর তথ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হয়েছে। গুজব ও সত্য আলাদা করার উদ্যোগ না থাকায় মানুষের মধ্যে স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অথচ এই আতঙ্ক দূর করাই ছিল অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।
২০২৬ সালের শুরুতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন এখন একটাই—এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ও অপরাধ কি বন্ধ হবে, নাকি এটি নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হবে? যদি রাষ্ট্র এখনো কেবল প্রতিক্রিয়া দেখানোতেই সীমাবদ্ধ থাকে, যদি নির্বাচন এলেই সহিংসতা মেনে নেওয়া হয়, যদি অপরাধের বিচার নিশ্চিত না হয়—তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান মানুষকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই স্বপ্ন আজ রক্ত, ভয় আর অনিশ্চয়তার নিচে চাপা পড়ছে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কারণ প্রতিটি খুন, প্রতিটি অপরাধ এবং প্রতিটি ব্যর্থ তদন্তই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রমাণ বহন করে।
— বিশেষ অনুসন্ধান, Sylheter Awaz
For more information
আরো দেখুন