সিলেট ১৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩রা মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

সিলেটে এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাহমিনা ইস্যুতে, হেরে গেল মানবতা জিতে গেল আইন

News Room
প্রকাশিত জুন ২৮, ২০২৫, ০৫:২৫ অপরাহ্ণ
সিলেটে এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাহমিনা ইস্যুতে, হেরে গেল মানবতা জিতে গেল আইন

 স্টাফ রিপোর্টারঃ  সিলেটে প্রতারণার শিকার এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাহমিনা আক্তার এর দুর্ভাগ্যের কাছে আবারও হেরে গেল মানবতা। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাহমিনার ১ বছরের সাজা নিশ্চিত করে যেন জয়ী হলো দেশের প্রচলিত আইন।

যার ফলে, পরীক্ষার হল থেকে বাসায় ফেরার বদলে তাহামিনার ঠাঁই হয়েছে কারাগারে। যে মেয়েটির কথা ছিল বাসায় গিয়ে মা হারা ছোট ভাইটিকে দেখাশোনা করবে অথচ দুর্ভাগ্যের শিকার হয়ে সেই মেয়েটি এখন ১ বছরের সাজা মাথায় নিয়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছে।

ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) সিলেট সরকারি কলেজে। দুর্ভাগ্যের শিকার ওই শিক্ষার্থী সিলেট মদনমোহন কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের একজন ছাত্রী।

জানাযায়, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার এক সৌদি প্রবাসীর সন্তান তিনি। তিন বোনের মধ্যে তাহমিনা সবার ছোট এছাড়াও পাঁচ বছর বয়সী তার একটি ছোট ভাই রয়েছে। তাহমিনার বাবাও অসুস্থতা নিয়ে প্রবাসী দিন কাটাচ্ছেন।

তাহমিনার বড় বোন রত্না জানান, ঘটনার দিন তাহমিনা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে সিলেট সরকারি কলেজে পৌঁছায়। ওই সময় তার কক্ষে দেখা যায় যে একই রোল নাম্বারের তিনি সহ দুজন শিক্ষার্থী রয়েছেন। ওই সময় সিলেট সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ কে অবগত করলে অধ্যক্ষ বিষয়টি মীমাংসার জন্য উভয়ে এডমিট কার্ড যাচাই-বাছাই করে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের সাথে যোগাযোগ করেন ওই সময় দেখা যায় যে তাহমিনার এডমিট কার্ড আসল নয়।

তাহমিনা ও তার বোন তখন অধ্যক্ষ ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের কে জানান যে, তাহমিনার বোন জামাই বিষয় টি জানেন। কিন্তু তিনিও ওইদিন ভোরবেলা ব্রেন স্ট্রোক করে মাউন্ট এডোরা হসপিটালে আইসিউতে ভর্তি রয়েছেন। তাহমিনার বোনজামাই অসুস্থ থাকার কারণে তিনি কার কাছ থেকে এই এডমিট কার্ড পেয়েছিলেন জানা যায়নি।

পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে কলেজ কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারেন যে তাহামিনা কারো দ্বারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন। সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ তখন উপস্থিত সবাইকে জানান যে, তাহমিনার ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে তাকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হবে।

তাহমিনার কাছে যে এডমিট কার্ড ছিল সেখানে লেখা ছিল তাহমিনা আক্তার, রেজিস্ট্রেশন নাম্বার ২০১৬৩০১০৭০ এবং রোল নাম্বার -৩০০৪৩৪শিক্ষাবর্ষ ২৩-২৪ এবং একই রোল নাম্বার এবং একই শিক্ষাবর্ষের অন্য ছাত্রী হলেন ফৌজিয়া আক্তার তিনিও মদন মোহন কলেজের শিক্ষার্থী। তার রেজিস্ট্রেশন নাম্বার ২০১৬৩০০৮৯৬। দুজনেই একই সাথে পরীক্ষার হলে উপস্থিত হলে তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ফৌজিয়ার এডমিট কার্ডটি সঠিক পাওয়া যায় এবং তাহমিনার এডমিট কার্ডটি সঠিক হিসেবে বিবেচিত না হওয়ায় তাকে আর পরীক্ষার সুযোগ দেয়া হয় নাই পরবর্তীতে ভ্রাম্যমান আদালত কর্তৃক পাবলিক এক্সামিনেশন অফেন্স এ্যাক্ট- ১৯৮০ সনের অপরাধে তাহমিনা আক্তার কে ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদ আশিক কবির।গত বৃহস্পতিবার ২৬ জুন এই আদেশ প্রদান করেন।

মদনমোহন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যক্ষ মোঃ মাহবুবুর রহমান বলেন, তাহমিনা আক্তার ২০২১২২ সনের শিক্ষার্থী এ বছর রেজিস্ট্রেশন করে নাই। পর অনেক খোঁজাখুঁজির পর তার পুরাতন রেজিস্ট্রেশনটি আমরা পাই তার মাধ্যমে জানতে পারি যে ২০২১-২২ সনের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। তবে তাহমিনার বোন অভিযোগ করেন যে, সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও মদন মোহন কলেজের অধ্যক্ষের সাথে যোগাযোগ করলে তাহমিনা মদন মোহনের ছাত্রী সেই বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

জানা যায়, তাহমিনা ২০২১-২২ শিক্ষা বর্ষের মদনমোহন কলেজ কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা অংশ গ্রহণের কথা ছিল কিন্তু পরীক্ষার কিছুদিন পূর্বে তাহমিনার মা মারা যাওয়ায় তিনি আর পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তখন মানসিকভাবে ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহমিনা। সুস্থ হতে আরো দু বছর সময় লাগে। পড়ালেখার প্রতি অতি আগ্রহের কথা বিবেচনা করে বড় বোন রত্না এবং বোনজামাই জুম্মনের সহযোগিতায় সে আবারো পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে চায়। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ তার জন্য একটু চাপ হওয়ায় তাহমিনার ইচ্ছে ছিল সে মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষা অংশগ্রহণ করবে। সেই লক্ষ্যে কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে তার বোন জামাই যোগাযোগ করলে প্রাথমিক অবস্থায় কলেজ কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেন কিন্তু তাহমিনার ফরম ফিলাপ করতে না পারায় তিনি স্থানীয় একটি মাধ্যম যিনি তাহমিনার রেজিস্ট্রেশন মানবিক বিভাগে করিয়ে দিবেন বলে নিশ্চয়তা দেন এবং পরীক্ষার আগের দিন তাহমিনার বোন জামাইকে উক্ত এডমিট কার্ডটি পৌঁছে দেন।

তাহমিনার বোন জামাই পরীক্ষার দিন সকালে ব্রেন স্ট্রোক করে সিলেট মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তাই তাহমিনাকে সরবরাহ করা এডমিট কার্ড টি কোন মাধ্যম সরবরাহ করেছিল তা এখনো জানা যায়নি। তবে পারিবারিক একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে স্থানীয় একটি অনলাইন সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান তাহমিনার ওই এডমিট কার্ডটি সরবরাহ করেছিল।

সবকিছু পর্যালোচনা করে বুঝা গিয়েছিল যে ঘটনায় তাহমিনা প্রতারণার শিকার হয়েছে। তাই তাহমিনা ন্যায় বিচার কামনা করতেই পারে। কিন্তু তাহমিনা এবং তার বোনের কোন কথা আমলে না নিয়ে তাহমিনাকে এক বছরের কারাদণ্ড মেনে নিতে হয়।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস জার্নালিস্ট কমিশনের সভাপতি ফয়সাল আহমেদ বাবলু বলেন, যেই শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়ে তার ভালো ফলাফল করে দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে অংশীদারি হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের শিকার তাহমিনা প্রতারকের খপ্পরে পরে শেষ হয়ে গেল তার পড়ালেখার স্বপ্ন এবং অপরাধ না করেও ভোগ করতে হবে ১ বছর অপরাধীর সাজা। সত্যিই এটা খুবই দুঃখজনক একটি ব্যাপার আমাদের উচিত তাহমিনার পাশে দাঁড়ানো এবং প্রকৃত দোষীর শাস্তি নিশ্চিত করা। তিনি আরো বলেন অথচ চাইলেই কি পারা যেত না? তাহমিনাকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা সেই প্রতারক ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনা এবং দ্রুত গতিতে তাহমিনার রেজিস্ট্রেশন সম্পূর্ণ করে তাকে আবারো পড়ালেখার সুযোগ তৈরি করে দেয়া। রাষ্ট্রের কি এই ক্ষমতাটুকু ছিল না? নাকি রাষ্ট্রকে চলতে হবে বাস্তবতা ও মানবতার বাইরে গিয়ে কাগজে লেখা কয়েকটি বাক্যের আইন দ্বারা সীমাবদ্ধতায়।

এখন দেখার বিষয়, পড়ালেখায় উৎসাহী তাহমিনা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা এডমিট কার্ডটি যারা সরবরাহ করেছিল তারা দায়ী নাকি তাহমিনা দায়ী।

সমস্ত বিষয়টি যদিও তখন পরীক্ষা হলের নিয়ন্ত্রণে থাকা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তা ব্যক্তিরা বুঝতে পেরেছিলেন। তারপরও তাহামিনার জন্য মানবতা তখন অসহায় হয়ে পড়েছিল কেননা দেশের আইন সবার আগে পালন করতে হবে। তাইতো তাহমিনার কাছে মানবতা হেরে গেলেও হেরে যায়নি দেশের আইন। তাই পড়ালেখার উৎসাহ দেখাতে গিয়ে প্রতারকের খপ্পরে পড়ে যে মেয়েটি পরীক্ষার হল থেকে পরীক্ষা দিয়ে হাসিমুখে ঘরে ফেরার কথা সেই মেয়েটি আজ ১ বছরের সাজা নিয়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে। এদিকে মা-হারা মেয়ে তাহমিনার এমন পরিণতির খবর শুনে অসুস্থ বাবাও দেশে ফিরতে না পারার আর্তনাদ নিয়ে ধোঁকছেন। আবার সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাহমিনাকে লালন পালন করা বোনজামাই আইসিউ থেকে সুস্থ হয়ে তাহমিনার জীবন ধ্বংসকারী সেই প্রতারকের নাম প্রকাশ করবেন সবার সামনে।

সময় হয়তো সকল প্রশ্নের উত্তর দিবে কিন্তু বর্তমানে তাহমিনার জন্য যে কারো মানবতা জাগ্রত হয়নি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

যদিও উদাহারন রয়েছে, দেশের প্রচলিত আইনে অনেক সাজা প্রাপ্তদেরকেও মানবিক দিক বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ড থেকে শুরু করে আরো অনেক বড় ধরনের সাজা মওকুফ করে দেওয়ার। এখন সময়ই বলবে তাহমিনা কি লঘু পাপে গুরুদন্ড নিয়ে আগামী এক বছর কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে আসামি হয়ে বসবাস করবে। নাকি দেশের প্রচলিত আইন মানবতার জন্য কোন ধারা- উপ ধারা খুঁজে তাহমিনাকে আবারো মুক্ত বাতাসে শিক্ষার্থী হয়ে পড়ালেখার সুযোগ করে দিবে।

For more information

আরো দেখুন

SYLAWAZ24/05/SabbirMotion