সিলেট , ,

তৃপ্তির ধোঁয়া চায়ের কাপে, কারিগররা যেন আধুনিক যুগের ‘ক্রীতদাস’

News Room
প্রকাশিত September 12, 2026, 04:37 PM
তৃপ্তির ধোঁয়া চায়ের কাপে, কারিগররা যেন আধুনিক যুগের ‘ক্রীতদাস’

তৃপ্তির ধোঁয়া চায়ের কাপে, কারিগররা যেন আধুনিক যুগের ‘ক্রীতদাস’

বিশেষ প্রতিবেদক, সিলেট | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সবুজ চা-পাতা আর কালচে তামাটে হাতের গভীর মেলবন্ধনে দাঁড়িয়ে আছে দেশের ঐতিহ্যবাহী চা-শিল্প। তামাটে হাতে পরম মমতায় তোলা ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ কারখানার ঘূর্ণায়মান যন্ত্র পার হয়ে তৃপ্তির ধোঁয়া ছড়ায় নাগরিক জীবনের চায়ের কাপে। তবে এ তৃপ্তির নেপথ্য কারিগররা আজও অধিকারবঞ্চিত। ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগানে বাণিজ্যিক উৎপাদনের মাধ্যমে সূচিত এই শিল্পের বয়স প্রায় পৌনে দুই শতক পেরিয়ে গেলেও বদলায়নি চা-শ্রমিকদের ভাগ্য। ব্রিটিশ আমলে ভারতের বিহার, ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ ও অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে ‘ভালো কাজের’ প্রলোভন দেখিয়ে সিলেটে নিয়ে আসা জনগোষ্ঠীর উত্তরসূরিরা নাগরিকত্ব পেলেও আজও পাননি ভূমির মালিকানা। বর্তমানে উদ্বাস্তু জীবনের মতো অনিশ্চয়তার কারণে পুলিশ ভেরিফিকেশন, সন্তানদের চাকরির আবেদন বা পাসপোর্ট তৈরিতে চরম প্রশাসনিক বিড়ম্বনার মুখে পড়ছেন তাঁরা।

সিলেট বিভাগের ২০৫টি চা-বাগানে কর্মরত প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার শ্রমিকের (স্থায়ী ৮৭ হাজার ও অস্থায়ী ৩৫ হাজার) জীবনযাপন যেন আধুনিক যুগের প্রাতিষ্ঠানিক দাসত্ব। দৈনিক ন্যূনতম ২০ থেকে ২৪ কেজি কাঁচা চা-পাতা উত্তোলনের শর্তে একজন স্থায়ী শ্রমিকের বর্তমান দৈনিক মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা, যা দিয়ে পরিবারের পুষ্টি বা ন্যূনতম বাজার খরচ মেটানো অসম্ভব। সপ্তাহে পরিবারপ্রতি ৩ কেজি ৪০০ গ্রাম চাল বা আটার নামমাত্র রেশন দেওয়া হলেও ৩৫ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক এই ন্যূনতম খাদ্য সহায়তা থেকেও পুরোপুরি বঞ্চিত। বাসস্থান হিসেবে স্থায়ী পরিবারগুলোর জন্য বরাদ্দ মাত্র ১৬০ বর্গফুটের বাঁশ-বেতের কাঁচা কুঁড়েঘর, যেখানে গাদাগাদি করে থাকতে হয় তিন প্রজন্মের সদস্যদের। পরিবার বড় হলে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ঘর বাড়ানোর সুযোগ নেই। অধিকাংশ বাগানের ডিসপেনসারিতে প্রাথমিক ব্যান্ডেজ ও প্যারাসিটামলের বাইরে উন্নত চিকিৎসার কোনো বন্দোবস্ত নেই; জটিল রোগে বাইরের হাসপাতালে গেলে মেলে না চিকিৎসার ব্যয়ভার। অবকাঠামো ও আর্থিক অনটনের কারণে প্রাথমিক স্তরেই ঝরে পড়ে সিংহভাগ চা-শ্রমিক সন্তান।

সরকারি চাকরিজীবীদের পে-স্কেলে যখন উল্লেখযোগ্য বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে, সেখানে চা-শ্রমিকদের ক্ষেত্রে মাত্র ৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাবকে সুস্পষ্ট বৈষম্য আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে চা-শ্রমিক ইউনিয়ন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সাথে সংগতি রেখে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি নির্ধারণ এবং বাগানের ভিটেমাটির স্থায়ী মালিকানার দাবিতে সিলেট ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন ভ্যালিতে নতুন করে রাজপথে নেমেছেন ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। তবে চা-বাগান মালিকদের দাবি, পাতা প্রক্রিয়াকরণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক নিলামের মন্দাভাবের কারণে বর্তমান ব্যয় সামাল দেওয়াই কঠিন। কালাগুল, ছড়াগাং ও বুরজান চা-বাগানের স্বত্বাধিকারী এনায়েত আহমদ মণি জানান, ভূমির মালিকানা একান্তই রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিষয় এবং বর্তমান বাজার বাস্তবতায় শ্রমিকদের দাবীকৃত ৫০০ টাকা দৈনিক মজুরি দেওয়া অসম্ভব। মালিকপক্ষের এমন অনড় অবস্থানের মুখে জীবনযাত্রার মান ও ন্যায্য অধিকার নিয়ে গভীর সংকটে রয়েছেন সিলেট অঞ্চলের সোয়া লাখ চা-শ্রমিক।

আবহাওয়া উন্নতির আভাস, সিলেটসহ কিছু অঞ্চলে হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা

For more information

আরো দেখুন